বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৭ অপরাহ্ন

কানে কানে লাখ টাকার দরদাম! চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জ—দেশের শুঁটকির ‘কানাকানি বাজার’

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট সময় : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২০ Time View

কানে কানে লাখ টাকার দরদাম!
চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জ—দেশের শুঁটকির ‘কানাকানি বাজার’
চট্টগ্রাম সিটি প্রতিনিধি, newsatvbd.com
একজন ক্রেতা আড়তদারের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলছেন একটি সংখ্যা। আরেকজন এসে একইভাবে বলে যাচ্ছেন নিজের দর। আশপাশে শত শত মানুষের ভিড়, অথচ কেউ শুনতে পাচ্ছেন না—কত টাকা দর উঠল!
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ ঘোষণা—শুঁটকির চালানটি বিক্রি হয়ে গেছে।
কিন্তু কত দামে?
সেটি তখনই জানা যায়।
এ দৃশ্য কোনো সিনেমার গল্প নয়। এটি চট্টগ্রাম নগরের আসাদগঞ্জ শুঁটকি পট্টির প্রতিদিনের বাণিজ্যের এক অভিনব চিত্র। দেশের অন্যতম বৃহৎ এই শুঁটকি পাইকারি বাজারে এখনো চলে এমন এক ব্যতিক্রমী ‘কানে কানে দরদাম’ বা whisper bidding পদ্ধতি। এ কারণেই স্থানীয়ভাবে অনেকে বাজারটিকে ‘কানাকানির বাজার’ বলেও চেনেন। �
শুঁটকি পট্টি, আসাদগঞ্জ, চট্টগ্রাম
কেন কানে কানে দাম বলা হয়?
একসময় আসাদগঞ্জে শুঁটকির দরদাম হতো অন্য সাধারণ বাজারের মতোই প্রকাশ্যে। ক্রেতা নিজের দর জোরে বলতেন, অন্যজন তার চেয়ে বেশি দর হাঁকাতেন। এভাবে একে অন্যের দর শুনে দাম বাড়তে থাকত।
কিন্তু প্রায় ৮–১০ বছর আগে সেই পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসে।
আসাদগঞ্জ শুঁটকি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ইব্রাহিম সৌদাগরের ভাষ্য অনুযায়ী, পাইকারি ক্রেতাদের অনুরোধেই নতুন এই পদ্ধতি চালু করা হয়। কারণ, দর প্রকাশ্যে জানাজানি হলে একজন ক্রেতার বলা দাম শুনে অন্যজন সামান্য বেশি দর বলে পণ্যটি নিয়ে নিতে পারতেন।
ফলে এখন প্রত্যেক ক্রেতা নিজের পছন্দের দরটি শুধু আড়তদারের কানে বলেন। অন্য ক্রেতা তার দর জানতে পারেন না।
ব্যবসায়ীদের ভাষায়, এতে প্রতিযোগিতাটা হয় তুলনামূলকভাবে গোপন ও স্বাধীন।
ধরা যাক, একজন বললেন ১ হাজার ৭০০ টাকা। পাশের ক্রেতা তা শুনে ১ হাজার ৭১০ টাকা বলার সুযোগ পেলেন না। তিনি নিজের হিসাব অনুযায়ী হয়তো ১ হাজার ৬৫০ অথবা ১ হাজার ৭৫০ টাকা দর দিতে পারেন।
অর্থাৎ এখানে ‘কে কত বলেছে’ নয়, ‘আমি কত দিতে প্রস্তুত’—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
আসল রহস্য এখানেই
আসাদগঞ্জের এই কানাকানি পদ্ধতির সবচেয়ে বড় রহস্য হলো—দর গোপন থাকে, কিন্তু চূড়ান্ত দাম গোপন থাকে না।
আড়তদার একে একে সবার দর শোনেন। সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে পণ্যটি বিক্রি করেন। লেনদেন চূড়ান্ত হওয়ার পর সবার সামনে দাম জানিয়ে দেওয়া হয়। ফলে একই পণ্যের জন্য পরে আবার দর বাড়ানোর সুযোগ থাকে না।
ব্যবসায়ীদের দাবি, এতে দরদাতাদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ কমে এবং প্রতিযোগিতাও তুলনামূলকভাবে ন্যায্য থাকে।
এই অদ্ভুত নিলাম ব্যবস্থাই আসাদগঞ্জকে অন্য সাধারণ পাইকারি বাজার থেকে আলাদা করেছে।
‘কানাকানি বাজার’ নামটি কীভাবে?
আসাদগঞ্জের সরকারি নাম শুঁটকি পট্টি বা আসাদগঞ্জ শুঁটকি বাজার। তবে বাজারে দরদামের এই অভিনব পদ্ধতির কারণে স্থানীয়ভাবে ‘কানাকানি বাজার’ নামটি জনপ্রিয় হয়েছে—এটি মূলত প্রচলিত ডাকনাম, সরকারি নাম নয়। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই ear-to-ear bidding বা কানে কানে দরদামের বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
শতবর্ষের বাজার, হাজার বছরের নয়
আসাদগঞ্জকে নিয়ে অনেক সময় ‘হাজার বছরের ঐতিহ্য’ কথাটি শোনা যায়। কিন্তু যাচাই করা তথ্য বলছে ভিন্ন কথা।
গবেষণাভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, আসাদগঞ্জের শুঁটকি বাজারের বয়স আনুমানিক ১০০ থেকে ১২০ বছর। বাজারটি কী সালে ঠিক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার নির্ভরযোগ্য লিখিত রেকর্ড পাওয়া যায়নি। শুরুতে কর্ণফুলী নদী থেকে মাছ ধরে স্থানীয়ভাবে শুকিয়ে এখানে বিক্রি করা হতো। পরে দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চল থেকে শুঁটকি আসতে শুরু করে।
অর্থাৎ ‘হাজার বছরের বাজার’ বলা তথ্যসম্মত নয়; ‘শতবর্ষী ঐতিহ্যের বাজার’ বলাই যথাযথ।
কীভাবে আসে এত শুঁটকি?
আসাদগঞ্জের সবচেয়ে বড় শক্তি এর বিশাল সরবরাহ নেটওয়ার্ক।
কক্সবাজার, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সোনাদিয়া, চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকা, সন্দ্বীপ, হাতিয়া, পটুয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চল থেকে শুঁটকি আসে এখানে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ডুবলার চরসহ আরও বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকেও শুঁটকি আসে।
দেশীয় সরবরাহের পাশাপাশি ভারত, মিয়ানমার ও পাকিস্তান থেকেও শুঁটকি আসে। ফলে বাজারটি এখন শুধু স্থানীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি একটি বড় আমদানি ও বিতরণ কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে।
আগে নদীপথে শুঁটকি পরিবহন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের সঙ্গে ঝুঁকি ও অন্যান্য কারণে সড়কপথের ব্যবহার বেড়েছে।
এক বাজার থেকে ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে
আসাদগঞ্জে শুঁটকি আসে, বাছাই হয়, সংরক্ষণ হয় এবং এরপর দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের হাত ধরে ছড়িয়ে পড়ে।
২০১২ সালের একটি গবেষণায় তখনই আসাদগঞ্জে ৬৩ ধরনের শুঁটকি পাওয়া গিয়েছিল। বর্তমানে বাজারে লইট্টা, ইঁচা বা চিংড়ি, ছুরি, ফাইস্যা, চ্যাপা, কোরাল, রুপচাঁদা, লাক্ষাসহ নানা ধরনের শুঁটকি পাওয়া যায়।
শুঁটকি শুধু খাবার নয়—এখানে এটি একটি বহুস্তরীয় বাণিজ্যব্যবস্থা। উৎপাদক থেকে ব্যাপারি, আড়তদার, পাইকার, খুচরা বিক্রেতা হয়ে শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় ভোক্তার হাতে।
বছরে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য!
বাজারটির অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম নয়।
চট্টগ্রাম শুঁটকি ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ওসমান হায়দারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আসাদগঞ্জে প্রায় ৫০টি শুঁটকির আড়ত এবং ৩৩০টি দোকান রয়েছে। আড়ত ও দোকান মিলিয়ে বছরে অন্তত ১ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয় বলে ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
আর ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে আসাদগঞ্জে সাপ্তাহিক প্রায় ১০০ কোটি টাকার বাণিজ্যের তথ্য উঠে এসেছে। একই প্রতিবেদনে বাজারটিকে দেশের বৃহত্তম শুঁটকি বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, এখানকার শুঁটকি ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশেও যায়।
এখানে অবশ্য ‘লেনদেনের পরিমাণ’ ও ‘রপ্তানি আয়’ এক বিষয় নয়—ব্যবসায়ী সংগঠনের হিসাবকে সেই হিসাবেই দেখা উচিত।
শুধু আমদানি নয়, রপ্তানিও হয়
আসাদগঞ্জের গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রপ্তানি।
একদিকে দেশের চাহিদা মেটাতে ভারত-মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশ থেকে শুঁটকি আসছে, অন্যদিকে বাংলাদেশে উৎপাদিত মানসম্মত শুঁটকি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন বাজারে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার এক প্রতিবেদনে দেশের মোট শুঁটকির চাহিদা ও আমদানিনির্ভরতার চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থাৎ আসাদগঞ্জ একই সঙ্গে দেশীয় শুঁটকির পাইকারি বিতরণকেন্দ্র, আমদানিকেন্দ্র এবং রপ্তানি-সংযুক্ত বাণিজ্যকেন্দ্র।
মৌসুমে বদলে যায় পুরো বাজারের চেহারা
শুঁটকির প্রধান মৌসুম সাধারণত শীতকাল ঘিরে। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাংলা আশ্বিন-কার্তিক থেকে চৈত্র পর্যন্ত বাজারে বেচাকেনার চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। এ সময় অনেক আড়তে দিনে কয়েক হাজার কেজি থেকে ১০-২০ হাজার কেজি পর্যন্ত শুঁটকি বিক্রির ঘটনা ঘটে।
মৌসুমে মাছের সরবরাহ বাড়ে, ফলে দাম কিছুটা কমতে পারে; একই সঙ্গে বেচাকেনার পরিমাণ বেড়ে যায়। আর বছরের অন্য সময়ে সরবরাহ কমে গেলে বাজার অপেক্ষাকৃত ধীর হলেও দাম তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে।
ইঁচা শুঁটকির আলাদা কদর
আপনার দেওয়া ছবিতে যে ছোট চিংড়ির শুঁটকি দেখা যাচ্ছে, চট্টগ্রামে সেটিই পরিচিত ‘ইঁচা শুঁটকি’ নামে।
সম্প্রতি আসাদগঞ্জের বাজারে ভালো মানের ইঁচা শুঁটকির দাম প্রায় ২ হাজার ৬০০ টাকা কেজি পর্যন্ত ছিল বলে ব্যবসায়ীদের উদ্ধৃত করে প্রথম আলো জানিয়েছে। আকার, মান ও উৎসভেদে দামের বড় পার্থক্য রয়েছে।
এই বাজারে আবার কয়েকশ টাকা কেজির শুঁটকি যেমন আছে, তেমনি লাক্ষা শুঁটকির দাম ৫ হাজার টাকা বা তারও বেশি হতে পারত
ঋণ, বিশ্বাস আর কোটি টাকার ঝুঁকি
এই ব্যবসার আরেকটি অজানা দিক হলো বাকিতে বেচাকেনা।
সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে জানা যায়, আসাদগঞ্জের শুঁটকি ব্যবসার একটি বড় অংশ দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও বাকির সম্পর্কের ওপর চলে। নিলামে শুঁটকি কিনে ব্যবসায়ীরা তা নিয়ে যান; পরে বিক্রি করে আড়তদারের টাকা পরিশোধ করেন। কখনো কখনো পুরো টাকা পরিশোধ করতে দীর্ঘ সময়ও লাগে।
অর্থাৎ কানে কানে দর বলা যেমন এই বাজারের বিশেষত্ব, তেমনি বিশ্বাসের ওপর কোটি কোটি টাকার ব্যবসা চালানোও এই বাজারের আরেক অনন্য বৈশিষ্ট্য।
তবে ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে সেই পুরোনো বিশ্বাসের জায়গায় ঝুঁকিও বেড়েছে। কেউ কেউ পণ্য নিয়ে ব্যবসা বন্ধ করে চলে যাওয়ায় বকেয়া আদায় নিয়ে সমস্যার কথাও উঠে এসেছে।
শেষ কথা
চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জ তাই শুধুই শুঁটকির বাজার নয়। এটি শতবর্ষী বাণিজ্যঐতিহ্য, উপকূলীয় জেলেদের উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি, আড়তদারি, পাইকারি ব্যবসা এবং অদ্ভুত ‘কানে কানে নিলাম’ সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনস্থল।
চারপাশে যখন ক্রেতা-বিক্রেতার কোলাহল, তখন কয়েকজন মানুষ আড়তদারের কানের কাছে মুখ নিয়ে যে নীরব দরদাম করেন—সেখানেই হয়তো ঠিক হয়ে যায় হাজার হাজার, কখনো লাখ লাখ টাকার শুঁটকির চালান।
এই নীরব দরদামের কারণেই আসাদগঞ্জের আরেক নাম—‘কানাকানি বাজার’।
দেশের বড় বড় বাজার নিয়ে নানা খবর হলেও আসাদগঞ্জের এই অদ্ভুত বাণিজ্যপদ্ধতি নিয়ে তুলনামূলকভাবে কমই আলোচনা হয়। অথচ শুঁটকির গন্ধমাখা এই সরু গলির ভেতরেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের উপকূলীয় অর্থনীতি ও এক শতবর্ষী বাণিজ্যসংস্কৃতির অসাধারণ গল্প।
—newsatvbd.com-এর নিজস্ব প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম সিটি

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © 2019 LiveTV
Powered By WP Solution