বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৪ অপরাহ্ন

বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানকে গ্রেপ্তারের চাপ দেন দুই সম্পাদক

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬
  • ২১১ Time View

এক-এগারোর অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তি লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী মুখ খুলেছেন। গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি এক এগারোতে তার ভূমিকা, তার সঙ্গে তৎকালীন সেনাপ্রধানের মতবিরোধ এবং এক্সিট প্ল্যান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। একাধিক গোয়েন্দা সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেছেন, সেনাবাহিনী বেগম জিয়া এবং তারেক রহমানকে গ্রেপ্তারের পক্ষে ছিলেন না।

কিন্তু সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বিশেষ করে, দুই সম্পাদক তাদের গ্রেপ্তারের জন্য রীতিমতো চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচন হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সমঝোতার ভিত্তিতে। বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এই সমঝোতার কারণেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে তাকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে বহাল রাখে।

ব্রিগেডিয়ার বারী এবং আমিনকে বিদেশে যেতে দেওয়া হয়, সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল মইনকে বহাল রাখা হয়। উল্লেখ্য, গত ২৩ মার্চ দিবাগত রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার নিজ বাসা থেকে মাসুদ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন ২৪ মার্চ পল্টন মডেল থানার মামলায় তার পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন আদালত। পরবর্তীতে গত ২৯ মার্চ দ্বিতীয় দফায় তার ফের ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

গত ৪ এপ্রিল তৃতীয় দফায় আরও তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। সবশেষ গত ৭ এপ্রিল পল্টন মডেল থানার মামলায় তিন দফায় ১৪ দিনের রিমান্ড শেষে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। ওইদিন দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

গত ১১ এপ্রিল এক-এগারোর আলোচিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ফের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা জানান, তাকে মূলত ২০০৭ সালের এক এগারোর ষড়যন্ত্র নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
সেনাপ্রধান হতে না পারার ক্ষোভ থেকেই বিএনপি বিরোধী অবস্থান : প্রায় তিন সপ্তাহের জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ সেনাবাহিনীর ভূমিকা এবং এক এগারোর ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার ভাই সাঈদ এস্কান্দার, মইন উ আহমেদ এবং তিনি বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে একসঙ্গে কমিশন করেন। এটা ছিল বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির প্রথম ব্যাচ। কমিশনের পর তিনি (জেনারেল মাসুদ) কিছুদিন রক্ষীবাহিনীতে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয়েছিল। অনেক সেনাসদস্যকে রক্ষীবাহিনীতে সংযুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এটাই তার পেশাগত জীবনে বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়ায় বলে দাবি করেন জেনারেল মাসুদ। তিনি বলেন, ২০০৫ সালের মে মাসে নতুন সেনাপ্রধান নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তিনি বলেন, সেনাপ্রধান হওয়ার জন্য আমিই ছিলাম সবচেয়ে যোগ্য। কিন্তু বিএনপি সরকার তার বদলে সাতজনকে টপকে জেনারেল মইন উ আহমেদকে সেনাপ্রধান করে। মাসুদ এটা মেনে নিতে পারেননি। এখান থেকেই তার মধ্যে বিএনপির প্রতি ক্ষোভ শুরু হয়। মাসুদ সুযোগ খুঁজতে থাকেন।

একটি টেলিফোন পাল্টে দেয় সবকিছু : মাসুদ উদ্দিন বলেন, ২০০৬ সালের শুরু থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে শুরু করে। তখন তিনি সেনাবাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশন অর্থাৎ নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি। নানা কারণেই এই ডিভিশনের গুরুত্ব অপরিসীম। এই ডিভিশনকে বলা হয়, সেনাবাহিনীর অন্যতম স্তম্ভ। মাসুদ বলেন, এ সময়ে তিনি একজন সম্মানিত সম্পাদকের ফোন পান। ইংরেজি দৈনিকের এই সম্পাদক তার সঙ্গে একান্তে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। মাসুদ বলেন, সাভার সেনানিবাসে তাকে আমন্ত্রণ জানালে তিনি রাজি হননি। তিনি আমাকে গুলশানের একটি বাসায় নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান। আমি তার প্রস্তাব গ্রহণ করি। মাসুদ বলেন, ২০০৬ এর অক্টোবরে গুলশানে একজন শিল্পপতির বাসায় আমি সস্ত্রীক যাই। ওই শিল্পপতি দুটি প্রভাবশালী সংবাদপত্রের মালিক। সেখানে আমি আরও কয়েকজন সুশীল সমাজের প্রতিনিধির সঙ্গে পরিচিত হই। তাদের মধ্যে বাংলা দৈনিকের সম্পাদক, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, লেখক এবং বুদ্ধিজীবী ছিলেন। সেখানে দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। নৈশভোজের ফাঁকে দুই সম্পাদক এবং একজন স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবী আমার সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় অংশ নেন। মাসুদ দাবি করেন, এই আলোচনায় রাজনৈতিক সংকটে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়। জেনারেল মাসুদ গোয়েন্দাদের কাছে দাবি করেছেন, আমি তিনজনকেই বলি সেনাবাহিনী চলে চেইন অব কমান্ডে, তাই এ বিষয়ে সেনাপ্রধানের সঙ্গে তাদের আলোচনা করা উচিত। তারা মাসুদকে জানান, সেনাপ্রধানের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে। তিনি আপনার ভূমিকা নিয়ে নিশ্চিত নন। মাসুদ বলেন, এ সময় আমি বলি সেনাপ্রধান সেনাবাহিনী এবং দেশের স্বার্থে যে সিদ্ধান্ত নেবে আমি তা পালন করব।

সেনাপ্রধানের ফোন : রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, ওই নৈশভোজের এক দিন পরই সেনাপ্রধান আমাকে ফোন করেন এবং জরুরি বৈঠকের জন্য সেনা সদরে আসতে বলেন। মাসুদ বলেন, মইন তার ভালো বন্ধু হলেও সেনাপ্রধান হওয়ার পর তার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তবে সেনা সদরের বৈঠকে তাদের দূরত্ব কমে যায়। ওই বৈঠকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। মইন তাকে জানান যে, আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করবে না। মাসুদ এই তথ্য বিশ্বাস করেননি। তিনি বলেন, ২২ জানুয়ারির নির্বাচন যদি আওয়ামী লীগ বর্জন করে তাহলে সেনাপ্রধান যে সিদ্ধান্ত নেবে তা আমি মেনে নেব। মাসুদ বলেন, এরপর দ্রুত পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। রিমান্ডে তিনি বলেন, ৮ জানুয়ারি সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকে আমরা ইয়াজউদ্দিনের সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করি। মাসুদ দাবি করেন, সেনাবাহিনীতে তিনি সেনাপ্রধানের চেয়ে জনপ্রিয় ছিলেন। এজন্য এক এগারোর সময় তাকে সামনে রেখে মইন সবকিছু করেছিলেন।

সুশীলদের চাপে বেগম জিয়া, তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত : রিমান্ডে মাসুদ উদ্দিন দাবি করেন যে, তিনি নিজে বা সেনাবাহিনী বেগম জিয়ার পরিবারকে গ্রেপ্তার করার পক্ষে ছিলেন না। কোর কমান্ডের বৈঠকে তাদের গৃহবন্দি অথবা বিদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বিশেষ করে, দুই সম্পাদক তাদের গ্রেপ্তারের জন্য রীতিমতো চাপ সৃষ্টি করে। মাসুদ দাবি করেন, আমি তাদের বলেছিলাম, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। তাঁকে আপামর সেনা সদস্যরা শ্রদ্ধা করে। জিয়া পরিবারকে গ্রেপ্তার করা হলে সেনাবাহিনীতে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে বলা হয়, দুই নেত্রীকে না সরালে দেশে রাজনৈতিক সংস্কার অসম্ভব। মাসুদ বলেন, আমি তখন দুই সম্পাদকে এ বিষয়ে জনমত তৈরি করতে বলেছিলাম। এরপর দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে দুটি সংবাদপত্র একাধিক সংবাদ প্রকাশ করে।

মইনের সঙ্গে আবার বিরোধ : রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ দাবি করেছেন যে, রাজনৈতিক দল গঠন নিয়ে সেনাপ্রধানের সঙ্গে তার মতবিরোধ দেখা দেয়। এক এগারোর মাঝামাঝি সময়ে মইন এরশাদের মতো রাজনৈতিক দল গঠন করে ক্ষমতা দখল করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। এজন্য তিনি ফেরদৌস আহমদ কোরেশীর নেতৃত্বে একটি কিংস পার্টি গঠন করেন। মাসুদ গোয়েন্দাদের বলেছেন, কখনোই আমি রাজনৈতিক দল গঠনের পক্ষে ছিলাম না। এর পরই তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেন বলে জানান।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা : রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন দাবি করেছেন, ২০০৭ সালের আগস্ট পর্যন্ত তিনি এক এগারোর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। তারপর তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন বলে দাবি করেন। এরপর তিনি রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পান।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © 2019 LiveTV
Powered By WP Solution